কুয়েট থেকে ভার্জিনিয়া টেকঃ আমার গল্প

Mohammad Shabbir Hasan, PhD Student, Virginia Tech

KUET CSE 2K3

people.cs.vt.edu/shabbir5



Steven Spielberg এর “Catch Me If You Can” মুভির শুরুর দিকের কিছু সংলাপ আমার খুবই প্রিয়।

Two little mice fell in a bucket of cream. The first mouse quickly gave up and drowned. The second mouse, wouldn’t quit. He struggled so hard that eventually he churned that cream into butter and crawled out. Gentlemen, as of this moment, I am that second mouse.

– Frank Abagnale Sr.



ভীষণ ইচ্ছে বাইরে পিএইচডি তে পড়তে আসার, কিন্তু ২০০৮ সালের মার্চের শেষ দিকে যখন কুয়েট থেকে পাশ করে বের হই তখন বাইরে পড়তে আসার জন্য যেটা খুব দরকার সেই সম্মানজনক রেজাল্টটাই ছিলোনা। ভাবলাম যাই হোক চেষ্টা টা তো করে দেখি, হলে হবে নাহলেও হওয়াতে হবে। নিজেকে তখন (এবং এখনো) উপরের দ্বিতীয় ইঁদুর টাই ভাবতে লাগলাম।

বাইরে পড়তে আসার জন্য কী কী করা লাগবে কিছুই জানি না, তো সব গুগল করে জানতে হবে। ভাবলাম যদি সফটওয়্যার কোম্পানিতে ঢুকি তাহলে হয়তো এনাফ সময় পাবো না তাই সিদ্ধান্ত নিলাম ভার্সিটির টিচিং এ যাবো। আমার রেজাল্টের যে বেহাল দশা তাতে আমাকে টিচার হিসেবে নেওয়ার কোন কারণ নাই, তবুও চেষ্টা করলাম। উত্তরা তে থাকতাম তখন, ওখানে আশেপাশে কিছু প্রাইভেট ভার্সিটি আছে। তো একদিন সকালে খাম ভর্তি সিভি নিয়ে বেরিয়ে পরলাম সরাসরি ডিপার্টমেন্ট হেড দের সাথে দেখা করে কথা বলার জন্য, যদি কোন সুযোগ পাওয়া যায় আরকি। সৌভাগ্য আমার, “এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ” এ তখন সি.এস.ই ডিপার্টমেন্টে একজন লেকচারার খুঁজছিল যে কিনা ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওয়েব সাইটটাও তৈরি করে দিতে পারবে। আমার রেজাল্ট যেহেতু টিচার হওয়ার মতো ছিলোনা, তাই তারা আমাকে ২টা ইন্টার্ভিউতে প্রোগ্রামিং রিলেটেড কোয়েশ্চেন করলো। কুয়েটে থাকতে আর যাই করি না কেন, প্রোগ্রামিং টা ভালো মত শেখার চেষ্টা করেছি, তাই ইন্টার্ভিউ গুলো ভালো হল আর আমিও জবটা পেয়ে গেলাম। ২০০৮ সালের ১৩ মে জয়েন করলাম  সি.এস.ই ডিপার্টমেন্টের লেকচারার হিসেবে।

জবের পাশাপাশি চলতে থাকলো আমার গুগল সার্চ যে বাইরে আসার জন্য কী কী করা দরকার। গুগল সার্চ আর কিছু সিনিয়র ভাইয়ের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম ফান্ডিং এর জন্য প্রফেসর ম্যানেজ করা লাগবে। তো সবার আগে ঠিক করতে হবে কোন দেশে যাবো; কারণ এডমিশন রিকোয়ারমেন্ট এক দেশের ভার্সিটি থেকে অন্য দেশের ভার্সিটির কিছুটা আলাদা। শুনলাম USA তে আসতে GRE না কি যেন একটা দিতে হয় যেটা খুবই কঠিন, তো লিস্ট থেকে USA বাদ। শুনলাম Canada তে GRE লাগে না, শুধু English Proficiency এর জন্য IELTS থাকতে হয়, কিছু ভার্সিটি আবার আমাদের কুয়েটের English Proficiency Certificate টা কে IELTS এর অল্টারনেটিভ হিসেবে একসেপ্ট করে। তো ভাবলাম Canada কেই তাহলে টার্গেট করি। আর IELTS থাকলে অস্ট্রেলিয়া তে এপ্লাই করা যাবে, তো অস্ট্রেলিয়া কেও লিস্টে যোগ করলাম। এর মধ্যে IELTS দিয়ে ফেললাম, আমার ব্যান্ড স্কোর ছিলো 7.

কানাডার যেসব ইউনিভার্সিটি তে এডমিশন রিকোয়ারমেন্ট কিছুটা স্যাটিস্ফাই করে সেগুলোর প্রফেসর দের ইমেইল দেওয়া শুরু করলাম (Memorial University of Newfoundland, University of Lethbridge, University of Calgary, University of Regina, Queens University, McMaster University, University of Saskatchewan etc.)। ২০০৮ এর অগাস্ট থেকে ২০০৯ এর অগাস্ট পর্যন্ত CS (Computer Science) এবং ECE (Electrical & Computer Engineering) এর মোটামুটি সব প্রফেসর দের প্রায় শ খানেক ইমেইল দিলাম, পজিটিভ রিপ্লাই (তাও waiting list) দিলো ১ জন (University of Calgary) সেটার ও ডিপার্টমেন্টের গ্র্যাজুয়েট কো-অরডিনেটর জানালেন আমি ডিপার্টমেন্টাল সব রিকোয়ারমেন্ট স্যাটিস্ফাই করিনা (ওদের IELTS রিকোয়ারমেন্ট ছিলো 7.5 কিন্তু আমার স্কোর ছিল 7), তাই আমার এডমিশন হওয়ার চান্স খুবই কম। প্রায় ১০টার মতো ইমেইলের রিপ্লাই ছিল নেগেটিভ (Sorry and wish you good luck) আর বাকী গুলো থেকে কোন রিপ্লাই ই নাই। এরপর ভাবলাম সেলফ ফান্ডিং এর কথা বলে দেখি প্রফেসর দের, তাও যদি আমাকে একটু সুযোগ দেয়। কারণ আমি শুনেছিলাম কানাডা তে প্রফেসর ম্যানেজ না করতে পারলে কোন লাভ নাই, কারণ প্রফেসর কন্টাক্ট ছাড়া এডমিশন হবেই না। কিছু ইউনিভার্সিটি (Memorial University of Newfoundland, University of Regina, University of Saskatchewan) তে এপ্লাই ও করে দিলাম সেলফ ফান্ডিং এ এডমিশন পাওয়াটা সহজ হবে এই ভরসায়। সব চেষ্টা শেষ হল ১০০% রিজেকশন দিয়ে। মানে দাঁড়ালো আমার প্রোফাইল এতটাই খারাপ যে আমি নিজের টাকায় পড়তে চাইলেও তারা আমাকে তাদের ভার্সিটিতে নিতে ইচ্ছুক না। ততদিনে আমার আন্ডারগ্র্যাড থিসিস থেকে একটা কনফারেন্স পেপার হয়ে গেলো যেটা আমার মনে হল আমার সিভি টাকে একটু হলেও ভালো শেইপে নিয়ে আসলো।

কানাডার ইউনিভার্সিটি গুলো থেকে এতো রিজেকশনের পর পুরোপুরিই হতাশ হয়ে গেলাম কিন্তু হাল ছাড়লাম না। USA যেহেতু আগেই আমার লিস্ট থেকে বাদ, তাই বাকী রইলো অস্ট্রেলিয়া। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার যে সিজিপিএ তা দিয়ে কোনভাবেই অস্ট্রেলিয়াতে ফান্ডিং পাওয়া সম্ভব না। তো কি করা যায় সেই আশায় সাজেশনের জন্য যোগাযোগ করলাম আমার আম্মার এক কলিগের ছেলের সাথে(কুয়েটের না), যিনি ওখানের একটা ভার্সিটির লেকচারার ছিলেন। সাজেশনের আশায় উনাকে ইমেইল দিলাম, উনি কিছু ভালো উপদেশ দিলেন যেমনঃ বাংলাদেশের কোন ভার্সিটি তে মাস্টার্স করে অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি তে এপ্লাই করা, কিন্তু সাথে আরো একটা সাজেশন দিলেন যেটা ছিল আমার জন্য কিছুটা শকিং। উনি আমাকে সাজেস্ট করলেন অস্ট্রেলিয়া তে এসে আবার আন্ডারগ্র্যাড এ ভর্তি হতে, যেহেতু কুয়েটে আমার কোর্স করাই আছে তাই ওইসব কোর্স এখানে করতে আমার সময় কম লাগবে, সেই সময় টা আমি অড জব করে হাত খরচের কিছু টাকা ইনকাম করতে পারবো। আরো বললেন আমার এই প্রোফাইলে এখানে মাস্টার্সে এডমিশন পাওয়া সম্ভব না, যেহেতু সিজিপিএ কম, তাই কনফারেন্স পেপার তেমন কোন হেল্প করতে পারবে না। এই রিপ্লাই পাওয়ার পর আর হতাশও হলাম না, কারণ হতাশ হওয়ার কোটা ততদিনে পূরণ হয়ে গেছে; শুধু মনে একটা প্রশ্নই আসলো, কুয়েট থেকে কী আমি এতটাই খারাপ রেজাল্ট করে বের হলাম যে আমাকে মাস্টার্সে এডমিশন পাওয়ার জন্য আবার আন্ডারগ্র্যাড এ ভর্তি হতে হবে?

কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে রিজেকশনের পর সুইডেন যাওয়ার ট্রাই করলাম, এডমিশনও হয়ে গেলো, ভিসাও পেয়ে গেলাম, কিন্তু যেতে ইচ্ছে করল না, ভাবলাম নর্থ আমেরিকা (কানাডা, ইউ.এস.এ) তে আরেকবার ট্রাই করি। তাই টিকেট কাটার কয়েকদিন আগে ঠিক করলাম সুইডেন যাবো না। কানাডা থেকে যেহেতু আগেই অনেক রিজেকশন চলে এসেছে তাই এইবার শুধু বাকী রইল ইউ.এস.এ। আমার এক আঙ্কেল যিনি কিনা ইউ.এস.এ তে থাকেন তিনি আমাকে সাহস দিলেন যে ইউ.এস.এ তে শুধু সিজিপিএ দেখে না, পাবলিকেশন্স থাকলে সেটা বেশ কাজে দেয় এডমিশন পাওয়ার জন্য। একটু আশার আলো দেখতে পেলাম। আমার অত্যন্ত এক্টিভ আন্ডারগ্র্যাড থিসিস এডভাইজার ডঃ আজহার স্যারের কল্যাণে ততদিনে আমার দ্বিতীয় কনফারেন্স পেপারটাও হয়ে গেলো। আগেই যেহেতু ঠিক করে রেখেছি যে GRE দিবো না, তাই গুগল করতে থাকলাম কোন কোন ইউনিভার্সিটি তে GRE ছড়াই এডমিশন পাওয়া যায়। একটা লিস্ট বানিয়ে ওইসব ভার্সিটির প্রফেসরদের ইমেইল দেওয়া শুরু করলাম। কোন রিপ্লাই পাই না এর মধ্যে ২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথমবারের মত East Stroudsburg University of Pennsylvania থেকে একজন প্রফেসর রিপ্লাই দিলেন যে তিনি আমাকে তার রিসার্চ গ্রুপে নিতে ইচ্ছুক যদি আমি Bioinformatics এ কাজ করতে রাজী থাকি। আমারতো পুরাই খুশী তে লাফানোর মত অবস্থা, ডিসেম্বরের বাংলাদেশের শীতেও তখন আমি আমেরিকার উইন্ডচীল ফীল করতে থাকলাম :D । বড় স্কুল, ছোট স্কুল, র‍্যাঙ্কিং এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তখন আমার নাই। লোকেও বলল “আরে আমেরিকার সব স্কুলই একি, সো একটা তে পরলেই হল”। আমিও মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে শুরু করলাম Fall 2010 এর এডমিশনের জন্য কাগজ পত্র রেডী করা।

যথাসময়ে এডমিশন ও ফান্ডিং (টিউশন ফ্রী আর সাথে মাসিক বেতন ৬২৫ ডলার)এর কাগজ পত্র চলে আসলো, ভিসার জন্য এপ্লাই ও করে দিলাম, ভিসা দিলো ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পর, তাই এডমিশন ডেফার করলাম স্প্রিং ২০১১ সেমিস্টার এ। ২০১১ সালের জানুয়ারী তে রওনা হলাম আমেরিকার উদ্দেশ্যে। আমার প্রফেসর খুবি ভালো মানুষ ও এক্টিভ রিসার্চার, তার সাথে পুরোদমে কাজ করতে থাকলাম। ঐ শহরে আমিই ছিলাম একমাত্র বাঙ্গালী, তো বাংলায় কথা বলতে পারতাম না বলে একটু খারাপ লাগতো কিন্তু রিসার্চের কাজটা এনজয় করছিলাম অনেক। মার্চ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিলো, হঠাত শুনলাম বাজেট কাট এর কারণে পরের সেমিস্টার (ফল ২০১১) থেকে পেন্সিল্ভ্যানিয়ার আউট অফ স্টেট স্টুডেন্ট (আমরা ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরাও এই ক্যাটাগরি তে) দের আর টিউশন ফী পুরোপুরি ফ্রী থাকবে না, আমরা ইন-স্টেট টিউশন ফী টা ওয়েভার পাবো কিন্তু আমাদের কে প্রতি সেমিস্টার ৩৫০০ ডলার করে পে করতে হবে। আমার তখন মাথায় হাত, প্রতি সেমিস্টারে এতো গুলো টাকা বাসা থেকে কিভাবে নিবো? তাই আবার শুরু করলাম ফল ২০১১ তে অন্য স্কুলে এডমিশন নেওয়ার চেষ্টা। GRE যেহেতু দেয়া ছিলোনা, আমার অপশান ছিল অনেক কম। সৌভাগ্য আমার, টিউশন ফ্রী আর সাথে টি.এ (প্রথম সেমিস্টার হাফ, পরের থেকে ফুল)নিয়ে আমার এডমিশন হল ওহাইও স্টেটের University of Akron এ। ইউনিভার্সিটি টা বড় কিন্তু কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট টা ছিল ছোট। গুগল ম্যাপের দেখলাম শহর টা সুন্দর আর জানলাম ওখানে অনেক বাংলাদেশী স্টুডেন্ট আছে, সো ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হলাম এক্রন এর উদ্দেশে।

প্রথম সেমিস্টার শেষে সেকেন্ড সেমিস্টারে এসে ফুল টি.এ পেলাম তো বেতন বেড়ে গেলো আর সাথে এক্রনের অসাধারণ বন্ধু-বান্ধব দের সাথে সময়টা অসাধারন চলে যাচ্ছিলো। সামার ২০১২ তে দেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখন আমার প্রফেসর জানালো ইউনিভার্সিটি নেক্সট সেমিস্টার থেকে “বাজেট কাট” এর কারনে কিছু টি.এ পজিশন বন্ধ করে দিতে পারে, আর তাঁর কাছেও আমাকে সাপোর্ট দেওয়ার মত ফান্ড নেই, তাই আমি যেন প্রস্তুত থাকি। আবারো সেই বাজেট কাট, আবারো সেই আগের দুশ্চিন্তা! এবার স্কুল পাল্টানোর কথা চিন্তা করা যাবেনা কারণ আমি এখানে অলরেডি ১ বছর শেষ করে ফেলেছি, আর ১ বছর পরই আমার মাস্টার্স শেষ। ফান্ড না থাকলে এই ১ বছর কিভাবে কি করবো সেই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে সামার ভ্যাকেশনে দেশে গেলাম।

অগাস্ট ২০১২ তে দেশ থেকে ফিরে এসে হাফ টি.এ পেলাম কিন্তু বেতন কমে গেলো অনেক খানি আর সেমিস্টার ফী, হেলথ ইন্সুরেন্স বেড়ে গিয়ে যা দাঁড়ালো তাতে ইঙ্কামের চেয়ে খরচ অনেক বেশী। আমাদের ডিপার্টমেন্ট টা ছোট হওয়াতে বাজেট কাট এর ইফেক্টটা আমাদের উপর বেশী পড়ল, আমার বন্ধুরা যারা অন্য ডিপার্টমেন্টে (ইলেক্ট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, কেমিক্যাল, সিভিল) ছিল তাদের উপর বাজেট কাটের ইফেক্ট টা পড়ল না কারণ তাদের ডিপার্টমেন্ট বড় ছিল তাই তাদের নিজেদের ফান্ড ও ভালোই ছিল। ২০১৩ এর ফল থেকে পিএইচডি শুরু করবো তো আপ্লিকেশন করার সময় ও চলে আসলো। ততদিনে পাবলিকেশন লিস্টে আরো কিছু পেপার যোগ হল আন্ডারগ্রাড থিসিস, সজীব (CSE 2k4), তনু (CSE 2k4), অভি (CSE 2k5), ফারহান (CSE 2k5, MIST) এর সাথে কাজ আর ২০১১ থেকে ২ জন (আমার পেন্সিল্ভ্যানিয়ার স্কুল, আর এক্রনের স্কুল এর)প্রফেসর দের সাথে কাজ করার সুবাদে। ছোট স্কুল বা বড় স্কুলের ছোট ডিপার্টমেন্টে যে ফান্ডিং নিয়ে সবসময় একটা টানাটানি সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ঠিক করলাম পিএইচডি এর জন্য বড় স্কুলের বড় ডিপার্টমেন্টেই এপ্লাই করবো। আমার এক্রনের বন্ধুরা অনেক সাহস দিলো সেটা অবশ্যই স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু বড় স্কুলে GRE ছাড়া এডমিশন দিবে না, তো কী আর করা GRE টা দিয়েই দিলাম, স্কোরটা খুব ভালো বলা যাবেনা, কিন্তু মাস্টার্স ডিগ্রী, পাবলিকেশন্স দিয়ে মোটামুটি ভালো একটা সিভি বানিয়ে ফেললাম। সাথে ছিলো অনেক সময় নিয়ে লিখা SOP, আর পারসোনাল ওয়েবসাইট যেটা তে প্রফেসররা আমার কাজের বিষয়ে জানতে পারবে। বেশ কনফিডেন্ট ছিলাম যে প্রফেসররা ভালো recommendation letter দিবে। সব মিলিয়ে কনফিডেন্টলি বড় কয়েকটা স্কুলে এপ্লাই করে দিলাম। অবশ্য উপরের র‍্যাঙ্কের স্কুল যেমন: University of Illinois at Urbana Champagne, Georgia Tech এগুলো তে এপ্লাই করতে পারলাম না কারণ আমি দেরী করে এপ্লাই শুরু করেছিলাম কিন্তু ততদিনে এপ্লিকেশন ডেডলাইন পার হয়ে গেছে।

পিএইচডি এর জন্য প্রফেসর ম্যানেজ করার জন্য ইমেইল দেওয়া শুরু করলাম। একটা কথা এখানে বলে রাখি, ২০০৮-৯ এ আমি যখন প্রফেসরদের ইমেইল দিতাম তখন দেখা যেত আমি কমন একটা ইমেইল লিখে ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদের একটানা সবাই কে পাঠিয়ে দিতাম। যে কারণে আমার ইমেইলটা পড়লেই তাঁরা বুঝতে পারতেন যে এটা কমন একটা ইমেইল তাই তাঁরা এটার রিপ্লাই দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তো পিএইচডি এর জন্য যখন প্রফেসরদের ইমেইল দিলাম তার আগে তাঁর ওয়েবসাইট টা ভালোমত স্টাডি করে নিলাম, তাঁর কারেন্ট রিসার্চ সম্পর্কে জেনে নিয়ে ইমেইল টা সেভাবে তৈরী করলাম। মানে হল প্রত্যেক প্রফেসর এর জন্য আলাদা আলাদা ইমেইল তৈরী করলাম এবং আগের মত একটানা সবাইকে ইমেইল না করে বেছে বেছে যাদের রিসার্চ ইন্টারেস্ট আমার কাজের সাথে মিলে তাদেরকেই শুধু ইমেইল দিলাম। এইবার আর আগের মতো এতো খারাপ অবস্থা হল না, ভালো কিছু স্কুল থেকে প্রফেসররা আগ্রহ দেখালেন, ইন্টারভিউ নিলেন, এসাইনমেন্ট দিলেন। ৬ টা স্কুলে এপ্লাই করেছিলাম তার মধ্যে ৪ টা তে অফার পেলাম এবং অবশ্যই ফুল ফান্ডিং, ভালো বেতন ও হেলথ ইন্সুরেন্স সাপোর্ট সহ। এরমধ্যে ভার্জিনিয়া টেক এর র‍্যাঙ্ক ভালো ছিলো আর এখানের যে প্রফেসর আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন তার কাজের সাথে আমার আগের কাজের অনেক মিল ছিলো, তাই সবশেষে ঠিক করলাম ভার্জিনিয়া টেক এই জয়েন করবো।

২০১৩ সালের অগাস্টে পিএইচডি তে জয়েন করার পর থেকে বুঝলাম বড় স্কুলের সুবিধা গুলিঃ

১. অসাধারণ রিসার্চ ফ্যাসিলিটি।

২. ফান্ডিং নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা নাই।

৩. ভালো ক্যারিয়ার ফেয়ার যেখানে গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, সিস্কো, ইন্টেল, অ্যামাজন থেকে লোক আসে ফুল্টাইম/ইন্টারনশীপ এর জন্য সিভি কালেক্ট করতে। শুধু কালেক্টই করেনা, ইন্টারভিউ এর জন্য ডাকেও। সবচেয়ে বড় কথা এসব কোম্পানির স্কুল ভিত্তিক রিপ্রেজেন্টেটিভ (নরমালি ঐ স্কুলেরই এলামনাই) থাকে যারা বিভিন্ন সময় সেমিনার দিয়ে থাকে যে এসব কোম্পানীর জন্য কিভাবে সিভি রেডী করতে হবে, কিভাবে ইন্টার্ভিউ এর জন্য প্রিপারেশন নিতে হবে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের অনেক আন্ডারগ্র্যাড এবং মাস্টার্স ও পিএইচডি স্টুডেন্ট পাশ করে এসব কোম্পানী তে ফুলটাইম এপ্লোয়ী হিসেবে জয়েন করেছে।

৪. বিভিন্ন রিসার্চ ল্যাবের নামকরা প্রফেসররা আসেন সেমিনার দিতে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় ফল ২০১৩ তে আমাদের এখানে সেমিনার দিতে এসেছিলেন ডঃ স্টিভেন চু যিনি ১৯৯৭ সালে ফিজিক্সে নোবেল পেয়েছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত বেল ল্যাবের সাবেক রিসার্চার ও বর্তমানে স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসর ডঃ চু ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত United States Secretary of Energy হিসেবে কাজ করেছিলেন। সাধারণত এসব সেমিনার শেষে আলাদা সেশন থাকে যেখানে স্টুডেন্টরা সেমিনারের স্পীকারদের সাথে সরাসরি রিসার্চ নিয়ে কথা বলতে পারে। নামকরা প্রফেসরদের সাথে এমন আলাদা ভাবে কথা বললে নিজের কাজের জন্য সেটা বেশ হেল্পফুল হয় বলে আমি মনে করি।

৫. বড় বড় কনফারেন্স/জার্নালে পেপার এক্সেপ্ট হওয়ার পর পাবলিকেশনের জন্য ইউনিভার্সিটি থেকে ফুল ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট দেয়া হয়। কনফারেন্স এটেন্ড করার জন্য ট্রাভেল গ্র্যান্টের ব্যাবস্থাও ডিপার্টমেন্ট থেকে করা হয়ে থাকে।

২০০৮ সালের এপ্রিলে লো সিজিপিএ নিয়ে পাশ করে বের হওয়া হতাশ আমি ২০১৩ তে ভার্জিনিয়া টেকে জয়েন করার পর আলহামদুলিল্লাহ এখন পর্যন্ত ভালো কিছু বুক চ্যাপ্টার (Elsevier), জার্নাল (BMC Human Genomics, BMC Genomics) ও কনফারেন্সে (ACM BCB, ISBRA) পেপার পাব্লিশ করার পাশাপাশি একটি অক্সফোর্ড জার্নাল (Briefings in Bioinformatics), একটি নেচার জার্নাল(Nature Scientific Reports)এ রিভিউয়ার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি যদি ছোট স্কুল বা বড় স্কুলের ছোট ডিপার্টমেন্টে থাকতাম তাহলে হয়তো এতো সুযোগ পেতাম না। আমি তাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার জুনিয়র দের এই অনুরোধ গুলো করতে চাইঃ

১. নিজের গোল এর ব্যাপারে ফিক্সড থাকতে হবে, হতাশ হয়ে কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আমি অনেক বার অনেক হতাশ হয়েছি কিন্তু পিএইচডি করবো এই গোল থেকে কখনো সরে আসিনি।

২. কুয়েট থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর আমার সিজিপিএ যেহেতু বাড়ানোর কোন সুযোগ ছিলনা, আমি তাই আমার কম সিজিপিএ নিয়ে মাথা ঘামাই নাই। বরং আমার চেষ্টা ছিলো আর কী কী করা যায় যাতে এই কম সিজিপিএ এর ইফেক্টটা অন্য কিছু দিয়ে ওভারকাম করা যায়। আমি খুবই কৃতজ্ঞ আমার আন্ডারগ্র্যাড থিসিস এডভাইজার ডঃ আজহার স্যারের কাছি যিনি আমি কম জিপিএ পাওয়া স্টুডেন্ট হওয়ার পরও আমাকে ভালো কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তিনিই প্রথম আমার মধ্যে এই বিশ্বাস টা এনেছেন যে ভালো রিসার্চ করার জন্য ও পেপার পাব্লিশ কারার জন্য ভালো সিজিপিএ টা মুখ্য না। মোট কথা সিজিপিএ ই শেষকথা না। তবে ভালো সিজিপিএ থাকাটা সবসময়ই বড় একটা  এডভান্টেজ।

৩. আমি এখন ভাবি আমি যদি সেই ২০০৮ সালে GRE টা দিয়ে বড় স্কুলে এপ্লাইটা করে দিতাম হয়তো আমাকে ফান্ডিং নিয়ে এতো টানাটানির মধ্য দিয়ে যেতে হতো না। সাথে বড় স্কুলের এতো ফ্যাসিলিটি আগে পেলে আমি আমার সিভি টা আরো ভালো করতে পারতাম। যাই হোক Better late than never. তাই ইউএসএ আসতে গেলে আগে থেকেই GRE টা দিয়ে দেওয়া ভালো।

৪. সেলফ ইম্প্রুভমেন্ট টা খুব দরকার, অনেক কিছুই পারতাম না যেগুলা নিজে নিজে সময় বের করে শিখেছি এবং এখনো শিখছি। আমার যেহেতু রিসার্চ ওরিয়েন্টেড ক্যারিয়ার গোল, আমি তাই আমার ফিল্ডে রিসেন্ট কী নিয়ে রিসার্চ হচ্ছে সেটা জানার চেষ্টা করি। এডমিশনের জন্য প্রফেসর সিলেকশনের ক্ষেত্রেও এটা বেশ কাজে দেয়। যে প্রফেসর কারেন্ট রিসার্চ হট টপিক নিয়ে কাজ করেন তাঁর হাতে ফান্ড থাকবেই, কিন্তু সেটা বের করার আগে জানতে হবে কারেন্ট রিসার্চের হট টপিকটা কি। আর সেজন্য নিজের একটু পড়াশুনাও করে নিতে হবে।

৫. Statement of Purpose (SOP) টা এডমিশনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গৎবাঁধা SOP না লিখে সময় নিয়ে ভালভাবে এটা লিখা উচিত। এডমিশন কমিটি গৎবাঁধা SOP দেখলেই বুঝতে পারেন যেটা কিনা এডমিশন ডিসিশনে খারাপ ইম্প্যাক্ট ফেলে। তাই SOP লিখে ইংরেজীতে দক্ষ কাউকে দিয়ে রিভিউ করে নিতে পারলে সেটা বেশ কাজে দেয়।

৬. সবশেষে নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, তোমার গোল বড় স্কুলে পিএইচডি করা বা গুগল/ মাইক্রোসফট এ জব করা যেটাই হোক না কেন, “আমি আমার গোলে পৌছাতে পারবোই” – নিজের উপর এই বিশ্বাস রাখা টা খুবই জরুরী। শুধু বিশ্বাস রাখলেই আবার হবে না, সে অনুযায়ী কাজ ও করে যেতে হবে।

শুভ কামনা সবাইকে।

Comments are closed.