স্বপ্নের দেশ আমেরিকাঃ-বাস্তবতা ও সফলতা

——————————————————————————

Naureen Binte Shahjahan

Graduate Research/Teaching Assistant

Department of Mechanical Engineering

South Dakota State University, Brookings, SD, USA

——————————————————————————–

আমরা কুয়েটিয়ানরা হয়তো বুয়েট কিংবা অন্য ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট দের মত বিএসসির ফাইনাল ইয়ার থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে খুব বেশি ফোকাস করতাম না। বেশিরভাগই পাস করার পর চাকরীতে ঢুকে যাই। (বাবা মার টাকায় আর কতদিন!!!)কিন্তু ইদানিং কুয়েটিয়ান ছোট ভাই বোনদের উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও চেষ্টা দেখে অনেক ভাল লাগে আর এইজন্যই হয়তো আমার নিজের পার্সোনাল অভিজ্ঞতা টা শেয়ার করে তাদেরকে আরেকটু প্রেরনা দেয়ার জন্য এই লেখাটা লিখলাম। (যদিও লেখালেখি আমার একদম ভাল লাগে না!!!)

স্টুডেন্ট হিসেবে কখনই আহামরি ভাল স্টুডেন্ট ছিলাম না কিন্তু খুব খারাপও ছিলাম না। বাবা মার স্বপ্ন ছিল ভাইয়ার মত আমিও বুয়েট এ পড়বো কিন্তু সেটা হল না। কুয়েটে ভর্তি হয়ে ফার্স্ট ইয়ার থেকেই চোখে রঙিন চশমা লাগল। সারাদিন ফ্রেন্ড দের সাথে আড্ডা, ধুমায়ে কার্ড খেলা, ঘোরাঘুরি এইসব করে প্রথম দুই বছর কাটালাম। ফার্স্ট ইয়ার থেকে স্যাররা অনেক সিরিয়াস থাকতে বলতেন কিন্তু কে শুনে কার কথা !!! সেইরকম রেজাল্ট ও হল (চার সেমিস্টার এ দুইটা সেকেন্ড ক্লাস আর দুইটাতে টেনেটুনে ফার্স্ট ক্লাস)।থার্ড ইয়ার এ উঠে মনে হল এবার একটু পড়াশুনা করা দরকার।এরপর মোটামুটি ভাল রেজাল্ট নিয়ে পাশ করলাম।

পাশ করার পর প্লান ছিল IELTS  আর GRE দিয়ে দেশের বাইরে পড়াশুনা করতে যাব কিন্তু কিসের কি!!! যখন দেখলাম ফ্রেন্ডরা সবাই চাকরি করে ইনকাম করতেসে তখন সব বাদ দিয়ে চাকরীতে ঢুকে গেলাম। প্রথম প্রথম খুব মজা লাগতো নিজের ইচ্ছামত খরচ করতেসি, লাইফ এনজয় করতেসি কিন্তু কিছু সময় পর বুঝতে পারলাম সবই বোকামি!! এই লাইফ এর কোন ভবিষ্যৎ নাই, কেমন যেন ফ্রাসটেশন কাজ করত। তারপর জব ছেরে দিয়ে GRE পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার মত অস্থির আর ফাঁকিবাজ মেয়ের পক্ষে GRE পড়া সম্ভব হয় নাই। এরপর আবার জব এ ঢুকলাম, কিন্তু চাকরি করতেও একদম ভাল লাগত না। হঠাৎ একদিন বন্ধু শাওন বলল ওদের ইউনিভার্সিটি তে মেকানিক্যাল এ নাকি GRE না থাকলেও আপ্লাই করা যায়। ইউএসএ তে যে GRE ছারাও অ্যাডমিশন হয় সেটা আমার ধারনাই ছিল না। লাইফ এ প্রথম কিছু একটা করার ইচ্ছা হল আর এইজন্যই রিস্কটা নিলাম। বেশ অনেক টাকা খরচ করে WES করালাম তারপর আপ্লাই করলাম। যদিও ওরা বলে যে ওদের ইউনিভার্সিটি তে GRE দরকার হয়না কিন্তু ইউএসএ এর প্রত্যেকটা ইউনিভার্সিটি তে যত স্টুডেন্ট আপ্লাই করে মোটামুটি সবারই GRE স্কোর থাকে। আর আমার প্রোফাইল ছিল এভারেজ, তাই আমার অ্যাডমিশন না হওয়ার চাঞ্ছ বেশি ছিল। যাইহোক, অ্যাডমিশন পেলাম কিন্তু আমি কোন প্রফেসর এর সাথে আগে যোগাযোগ করি নাই। গ্র্যাজুয়েট কো-অরডিনেটর কে ই-মেইল করলাম। আমার আগে আরেকটা ফ্রেন্ড এর অ্যাডমিশন হইসিল আর ওর প্রোফাইল খুব ভাল ছিল আমার চেয়ে। ওকে গ্র্যাজুয়েট কো-অরডিনেটর জানালো যে মেকানিক্যাল এ আপাতত কোন পজিশন খালি নাই। আমি ভাবলাম তাহলে তো আর ওনাকে ই-মেল দিয়ে লাভ হবেনা। তারপরও ই-মেইল দিলাম, উনি রিপ্লাই দিয়ে বলল, “ Let me see what I can do for you” এটা পজিটিভ না নেগেটিভ রিপ্লাই কিছুই বুঝলাম না!!! তখন শাওন বলল ফিজিক্স ডিপার্টমেনটের গ্র্যাজুয়েট কো-অরডিনেটর কে ই-মেইল করে দেখতে। ওখানে TA পাওয়া যেতে পারে। আমি ই-মেইল করার পর উনি বলল ফিজিক্স ডিপার্টমেনটে আমার সব কাগজপত্র আর অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে। তখন আমি প্রায় হাল ছেরে দিচ্ছিলাম কারন আবার নতুন করে কাগজপত্র পাঠানোর মত কোন ইচ্ছা, সময়, টাকা কোনটাই আমার ছিল না। পরেরদিন আমি ই-মেইল পেলাম যে আমার সব কাগজপত্র মেকানিক্যাল ডিপার্টমেনট থেকে ফরোয়ার্ড করে recommend করা হয়েছে এইজন্য ওরা আমাকে TA দিল !! আমি সত্যি অনেক খুশি হইসিলাম (কারন ফিজিক্স ডিপার্টমেনট মেকানিক্যাল এর চেয়ে বেশি টাকা দেয়।) অ্যাডমিশন হল, ফান্ডও পেলাম, বাকি ছিল ভিসা। অনেকেই আমাকে বলসিল  আমার GRE স্কোর না থাকার কারনে ভিসা নাও পেতে পারি। কিন্তু আমার ভিসা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেসিল। তারপর চলে আসলাম স্বপ্নের দেশ আমেরিকা তে !!!

এখানে আসার পর এখন পর্যন্ত আমাকে খুব একটা হার্ড টাইম পার করতে হয়নাই। প্রথম সেমিস্টার এর পর প্রফেসর এর সাথে কথা বলে RA ও ম্যানেজ করে ফেললাম। তারপর সামার এ টিকেট কেটে দেশে ঘুরে আসলাম। এরপর আবার নতুন করে সবকিছু শুরু। কোর্সওয়ার্ক সব শেষ করে ফেললাম ৪.০০ আউট অফ ৪.০০ সিজিপিএ নিয়ে, এখন শুধু থিসিস শেষ করতে হবে। লো র‍্যাঙ্কড ইউনিভার্সিটি তে পড়তে আসছি দেখে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ কেউ সরাসরি আবার কেউ গোপনে হাসাহাসি করে। সেটা নিয়ে যে খুব একটা দুঃখ লাগে তা না কিন্তু আরেকটু ধৈর্য ধরে GRE পরীক্ষা দিয়ে ফেলে ভাল কোন ইউনিভার্সিটি তে পড়লে হয়ত এই অবজ্ঞা তা পেতে হত না !!! আমি যেরকম effort দিসি সেরকমই রেজাল্ট পাইসি এইজন্য আমার কোন দুঃখ নাই। র‍্যাঙ্ক যাইহোক না কেন ইউএসএ ঢুকাটাই মূল উদ্দেশ্য, তারপর একটা না একটা ব্যাবস্থা হয়ে যাবেই।

সবশেষে আমি এটাই বলব যে, ইউএসএ তে উচ্চশিক্ষার জন্য আসতে চাইলে সবার আগে মাইন্ড সেটআপ করে অনেক ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা করতে হবে।বিশেষ করে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড এ ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডে মেয়েদের কে অনেক প্রায়োরিটি দেয়া হয় তাই কুয়েট এর মেয়েদের জন্য সাজেশন থাকবে তারা যেন এই সুযোগ টাকে কাজে লাগায়। আমাদের সমাজ এবং পরিবার মেয়েদের একা একা বিদেশে পড়াশোনা টা খুব বেশি সাপোর্ট করে না। কিন্তু এখন অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে, তাই নিজের স্বপ্ন আর লক্ষ্য পূরণের জন্য কোন বাঁধার কাছে হার মানার দরকার নাই। কুয়েটের অনেক বড় ভাইয়া এবং আপুরা ইউএসের অনেক ইউনিভার্সিটি তে আছেন যারা সবাই অনেক হেল্পফুল।

আমি কখনই বলবনা যে আমার মত ফাঁকিবাজ এর কাছ থেকে প্রেরনা নিয়ে GRE পড়া বাদ দিয়ে ইউএসএ তে চলে আসতে!!! আমার ক্ষেত্রে হয়তো ভাগ্য সহায় ছিল, সবার ক্ষেত্রে সেটা নাও হতে পারে। দুনিয়াতে কোন কিছুই এমনি এমনি হয়না, কষ্ট করে অর্জন করতে হয়। এখনি সময় সেই সাফল্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার। এই লম্বা পথ পার করার জন্য সবার প্রতি শুভকামনা রইল।

নওরীন বিনতে শাহজাহান

Comments are closed.